| ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে যে প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে

রিপোর্টারের নামঃ ডেস্ক নিউজ
  • আপডেট টাইম : 14-06-2025 ইং
  • 139957 বার পঠিত
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে যে প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে
ছবির ক্যাপশন: ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে যে প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান টানাপোড়েন নতুন কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু এবারের উত্তেজনা যেন একেবারে বিস্ফোরণের মুখে। পারমাণবিক ঝুঁকির ভয়, আকাশপথে যুদ্ধবিমানের চক্কর, বন্ধ হয়ে যাওয়া বাণিজ্যপথ সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। এরই মধ্যে তেলের দাম বাড়ছে, স্বর্ণের বাজার উর্ধ্বমুখী, আর বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে নেমে এসেছে ভয়ানক চাপ। এই সংঘাত যদি আরও ঘনীভূত হয়, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, প্রভাব পড়বে ব্যাংকক থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত সবখানেই।

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭৫ ডলার ছাড়িয়েছে, যা গত পাঁচ মাসে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে স্বর্ণের দামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। শুক্রবার লন্ডন স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম উঠেছে ৩ হাজার ৪৩৫ ডলারে। থাইল্যান্ডে স্বর্ণের দাম ভরি প্রতি ৫৩ হাজার ৩৫০ থাই বাথে পৌঁছেছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই দাম ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তেলের দামে আগুন, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা

ইরান ও ইসরায়েল উভয়ই তেল উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছে। ইরান বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারকদের মধ্যে অন্যতম। আবার ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে যুক্ত হয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা, যারা এর আগেও লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ১৩ শতাংশ বেড়ে যায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭৫ ডলার ছাড়িয়ে ৮০ ডলারের কাছাকাছি চলে যায়। আমেরিকার ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও ৭২ ডলার থেকে বেড়ে ৮১ ডলার ছুঁয়েছে।

বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ আরও তীব্র হলে এ দাম ৯০ থেকে ১০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এতে পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়বে বিশ্বজুড়ে, যার চাপ সাধারণ মানুষের ঘাড়েই পড়বে।

স্বর্ণের দামে নতুন রেকর্ড

যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ঝুঁকছেন স্বর্ণের দিকে। শুক্রবার লন্ডনের স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৪৩৫ ডলারে পৌঁছায়, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

থাইল্যান্ডে স্বর্ণের দাম ভরি প্রতি পৌঁছেছে ৫৩ হাজার ৩৫০ থাই বাথ। দেশটির স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দাম ৬৫ হাজার থাই বাথ ছাড়িয়ে যেতে পারে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ডলারেও পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশ, ভারত, সৌদি আরবসহ অনেক দেশেই স্বর্ণের দাম বাড়তে শুরু করেছে।

শেয়ারবাজারে ধস, নিরাপদ পুঁজির দিকে ঝুঁকছে বিশ্ব

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন। শুক্রবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও নাসডাক সূচক উল্টো পথে গেছে। জার্মানির ডিএএক্স সূচকে এক দিনে সর্বোচ্চ পতন হয়।

একই চিত্র দেখা গেছে এশিয়ার বাজারেও, জাপানের নিক্কেই, ভারতের সেনসেক্স এবং হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচকে বড় পতন হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন শেয়ার ছেড়ে সরকারি বন্ড, মার্কিন ডলার এবং স্বর্ণে পুঁজি সরাচ্ছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে ঝুঁকি, বিমান চলাচলে বিঘ্ন

ইসরায়েল, ইরান, জর্ডান এবং ইরাক নিজেদের আকাশপথ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে ইউরোপ থেকে এশিয়ামুখী অনেক বিমান এখন বিকল্প রুট ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে, যেগুলো দীর্ঘতর ও ব্যয়বহুল।

বিমান সংস্থা এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ এবং ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাওয়া ফ্লাইট বাতিল করেছে বা রুট পরিবর্তন করেছে। এতে করে টিকিটের দাম বাড়ছে এবং যাত্রার সময় দীর্ঘ হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে আমদানি-রপ্তানি বিলম্বিত হতে পারে।

ভয়ঙ্কর আশঙ্কা: হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে কী হবে?

বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে, যা ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত। যুদ্ধ আরও তীব্র হলে ইরান এই পথ বন্ধ করে দিতে পারে।

মার্কিন গবেষণা সংস্থা ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন বলছে, এই প্রণালি বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বিপর্যস্ত হবে, তেলের দাম ১২০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ইসরায়েলে জরুরি অবস্থা, জনমনে আতঙ্ক

ইসরায়েলে এক ধরনের জরুরি পরিস্থিতি চলছে। দেশটির মুদ্রা শেকেল এক দিনে ২ শতাংশেরও বেশি দর হারিয়েছে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দোকানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ক্যারেফোর সুপারমার্কেট বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের ক্রেতা সংখ্যা বেড়েছে ৩০০ শতাংশ। পণ্যের মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে অনেক শাখায়।

বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ২.৩ শতাংশে থাকার কথা। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা কমে ২.১ শতাংশে নেমে যেতে পারে।

বিশ্লেষক আথ পিসালভানিচ বলেন, ‘তেলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি নয়, পরিবহন, কৃষি, খাদ্যপণ্য সবখানেই মূল্যবৃদ্ধি হবে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আবার সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হবে, যা ভোক্তা ব্যয় ও বিনিয়োগ দুই কমিয়ে দেবে।’

বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর পাশাপাশি উদীয়মান দেশগুলোর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব হবে বেশি। বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর দেশ যেমন থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া এই দেশগুলো উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে সমস্যায় পড়বে।

যুদ্ধ থামবে না থামবে, চোখ এখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে

বিশ্লেষকরা দুই ধরনের পূর্বাভাস দিচ্ছেন- একটি মতে, এই যুদ্ধ সীমিত পর্যায়ে থাকবে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কূটনৈতিক মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আসবে।

অন্য মতটি বলছে, যদি আমেরিকা ও হিজবুল্লাহসহ অন্য শক্তিগুলো সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তা রূপ নিতে পারে একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে।

বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে। কারণ এই সংঘাত থামানো না গেলে, শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ঢুকে পড়বে এক অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। তথ্য সূত্র: রয়টার্স, ন্যাশন, বিবিসি

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ Gen Z Bangladesh Online - জেন জি বাংলাদেশ অনলাইন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ